ঘুষ নিয়ে নার্সদের বদলি, সত্যতা মিলেছে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে!

সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্স বদলিতে জামাল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির কোটি কোটি টাকা ঘুস লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নার্সদের কাছ থেকে ঘুস হিসেবে টাকা নিতেন তিনি। তার বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে, থাকেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে।

দেশের সব হাসপাতালে নার্স বদলি, অর্থ লেনদেন, বাণিজ্য সংক্রান্ত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ওই নির্দেশের পর এ বিষয়ে দুদক সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল।এর আগে গত ১৮ মে দেশের সব হাসপাতালে নার্স বদলি, অর্থ লেনদেন, বাণিজ্য সংক্রান্ত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) মামলার বিবাদী জামাল উদ্দিন, তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যসহ বদলি-বাণিজ্যে চিহ্নিত-জড়িতদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার জন্য বলেছেন আদালত। পাশাপাশি বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতেও বলা হয়।

নির্দেশনার আলোকে তদন্তের আংশিক একটি প্রতিবেদন এসেছে বলে  নিশ্চিত করেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব।মঙ্গলবার (১৮ অক্টোবর) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ সংক্রান্ত দুদকের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। নার্স বদলিতে অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত চেয়ে করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে এ প্রতিবেদন তৈরি করে দুদক।

দুদকের উপ-পরিচালক ফারুক আহমেদের সই করা প্রতিবেদনে বলা হয়, জামাল উদ্দিন সরকারি কর্মকর্তা এবং নার্সদের বদলির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না হয়েও তার ব্যাংক হিসাবে দেশের বিভিন্ন জেলার নার্সরা ঘুষ বাবদ টাকা জমা দিয়ে বদলি হয়েছেন।এ ক্ষেত্রে নার্সদের বদলির সঙ্গে বদলি সংশ্লিষ্ট (নার্সিং ও মিডওয়াইফারি) কোনো সরকারি কর্মকর্তা ঘুস বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আছেন কি না, তা নির্ণয় হওয়া জরুরি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জামাল উদ্দিনের সংশ্লিষ্ট চারটি আলাদা (অ্যাকাউন্ট) হিসাবে মোট ৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। মূলত দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত নার্সরা নিজ নিজ জেলায় বা বিভাগে বদলির জন্য জামাল উদ্দিনকে এ টাকা দিয়েছেন। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের এক বা একাধিক কর্মকর্তার সহায়তায় জামাল উদ্দিন ঘুস ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত নার্সদের তাদের পছন্দের কর্মস্থলে বদলি করেছেন বলে নার্সরা জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি দপ্তরের এক বা একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে জামাল উদ্দিনের সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য ওইসব কর্মকর্তার আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে হাইকোর্টে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বদলির জন্য নার্সদের কাছ থেকে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা ঘুস গ্রহণ করে জামাল উদ্দিন ও তার সহযোগীরা। ৫টি ব্যাংকের ১৪টি হিসাব নম্বর ব্যবহার করে এ ঘুষ নেওয়া হয়। যার মধ্যে জামালের নামে আলাদা চারটি অ্যাকাউন্ট।

হাইকোর্টে প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের কোন কোন কর্মকর্তা ঘুস গ্রহণের মাধ্যমে এ নার্স বদলিতে জড়িত সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে আদালতে দাখিল করতে দুদককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য আগামী ২০ জানুয়ারি দিন ঠিক করেছেন হাইকোর্ট।

জানা গেছে, এরই মধ্যে দুদকের পক্ষে থেকে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি দপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের ব্যাংক লেনদেনের হিসাব বিবরণী চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে রিটকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. হুমায়ুন কবির পল্লব বলেন, আদালতে আংশিক প্রতিবেদন দাখিল করেছে দুদক। ২০ জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে দুদককে বলা হয়েছে।

জানা গেছে গত বছরের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর তিন মাসে প্রায় চার হাজার নার্সকে বদলি করা হয়েছে। সেই বদলির মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইভ ফাউন্ডেশনের পক্ষে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন দুই আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মাজেদুল কাদের। ওই লিগ্যাল নোটিশের পর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় এ রিট করা হয়।

scroll to top