বাড়ি ফিরে পেতে আদালতে ৩০ বছর রোকেয়া


আব্দুল্লাহ আল-মামুন, কোর্ট রিপোর্টার। দিনাজপুর জেলার উপশহর এলাকার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৫৬)। ১৯৯০ সালে সরকারের গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া একটি বাড়ির দখল ফিরে পেতে আদালতের বারান্দায় কেটে গেছে ৩০ বছর। সর্বশেষ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে হাজির হয়েছেন তিনি। দ্রুত মামলাটি শেষ করে দিতে প্রধান বিচারপতির কাছে জানিয়েছেন আর্জি।

রোববার (১৬ অক্টোবর) প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চে বিচার কাজ চলার শেষ মুর্হূতে রোকেয়া বেগম আদালতের ডায়াসে গিয়ে দাঁড়ান। তখন প্রধান বিচারপতি তার কাছে জানতে চান, কিসের মামলা?

তিনি আইনজীবীর নাম বলতে পারেননি। এ সময় তার মামলার অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড শিরীন আফরোজ তার কাছে গিয়ে হাজির হন। এ সময় প্রধান বিচারপতি তার কথা শোনেন। মামলাটি দ্রুত তালিকায় আসবে বলেও আশ্বস্ত করেন।

এ বিষয়ে রোকেয়া বেগম বলেন, আশির দশকের শেষের দিকে সরকার থেকে একটি বাড়ি বরাদ্দ পান। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় সে বাড়ি তার বেদখল হয়। বিচারিক (নিম্ন) আদালতসহ উচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায়ও রোকেয়া বেগমের পক্ষে রয়েছে। এরপর এত বছরেও তিনি বাড়ি বুঝে নিতে পারেননি। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, আদালতের রায় পক্ষে এলেও তারা (বিবাদীপক্ষ) একটির পর একটি আবেদন করে দীর্ঘসূত্রিতা করছে।

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে চাকরি করে আসা এই নারী এখন বৃদ্ধা। তার দুটি কিডনিতেই সমস্যা। একটি মেয়ে মারা গেছে। এখন একটি ছেলে আছে গাজীপুরে পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। স্বামীও অসুস্থ।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে চাকরির সুবাদে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৯ সালের ১০ মার্চ দিনাজপুরের উপশহর এলাকায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে একটি বাড়ি বরাদ্দ পান রোকেয়া বেগম। ১৯৯০ সালে বাড়িটি তার নামে তালিকাভুক্ত হলে স্বামী-সন্তান নিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। এ বাড়ির ঠিক বিপরীতে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন মো. নুর ইসলাম নামের জনৈক এক ব্যক্তি। প্রতিবেশী হওয়ায় রোকেয়া বেগমের পরিবারের সঙ্গে এক সময় সখ্যতা গড়ে ওঠে নুর ইসলামের পরিবারের। ১৯৯০ সালের ২ সেপ্টেম্বর রোকেয়া বেগম স্বামী-সন্তান নিয়ে বেড়াতে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় বাবার কাছে বেড়ানো শেষে ফিরে গিয়ে দেখেন বরাদ্দ পাওয়া বাড়ি দখলে নিয়েছেন প্রতিবেশি নুর ইসলাম। তখন ‍নুর ইসলাম বাড়ির দখল না ছেড়ে বরং স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করতে যাওয়ার আগে রোকেয়া বেগম নাকি ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে বাড়িটি তার কাছে হস্তান্তর করে গেছেন বলে দাবি তোলেন।

প্রমাণ হিসেবে ৩০ টাকার স্ট্যাম্পে দখল হস্তান্তরের দলিল দেখান নুর ইসলাম। এরপর হাউজিং এস্টেটের বিধিমালা অনুযায়ী (খ) তফসিলের এ বাড়িটি তার নামে তালিকাভুক্ত করতে নির্ধারিত ফরমের মাধ্যমে আবেদন করেন।

এ ঘটনায় জোর করে বাড়ি দখলে নেওয়ার অভিযোগ এনে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন রোকেয়া বেগম। অভিযোগ পেয়ে তা তদন্তের নির্দেশ দেয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। তদন্তে নুর ইসলাম বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় পূর্ত মন্ত্রণালয় ১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট নুর ইসলামের বরাদ্দ আদেশ বাতিল করে। বরাদ্দ বাতিলের এ আদেশ পুনর্বিবেচনা চেয়ে স্থানীয় সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে আবেদন করেন।

এরপর নানান ধাপ পেরিয়ে, সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্টের লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করেন বৃদ্ধা। মামলাটি পর্যালোচনা করে রোকেয়া বেগমকে আইনি সহায়তা দিতে আইনজীবী শিরীন আফরোজকে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড নিয়োগ দেয় সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস।

scroll to top