বিশ্বকবির কাচারিবাড়ির সৌন্দর্য বিকৃতের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থার নির্দেশ!

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে অবস্থিত বিশ্বকবি রবীন্দ্র ঠাকুরের রবীন্দ্র কাচারিবাড়ি এলাকার সৌন্দর্য বিকৃতের অভিযোগ আইন অনুসারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) হাইকোর্টের বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন।আদালতে এদিন রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র কাচারিবাড়ির প্রত্নতত্ত্বের পার্শ্ববর্তী এলাকায় পুরাকীর্তি সংরক্ষণ বিধি অমান্য করে ভবন নির্মাণ করার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ২০১৪ সালে হাইকোর্টে রিট করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ।ওই রিটের শুনানি নিয়ে একই বছরের ৫ আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করে স্থিতাবস্থার আদেশ দেন। ওই রুলের শুনানি শেষে মঙ্গলবার এ রায় দিলেন হাইকোর্ট।

পরে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, আদালত রুলটি নিষ্পত্তি করে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলাটি চলমান রেখেছেন।মনজিল মোরসেদ আরও জানান, আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন, রবীন্দ্র কাচারিবাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে এবং অভিযোগ আছে এর সৌন্দর্য বিকৃত করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

আদালত নির্দেশনায় বলেন— ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইন এবং সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে রবীন্দ্র কাচারিবাড়ির সৌন্দর্য বিকৃত করার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী যদি প্রয়োজনে মনে করে তা হলে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে হলে নিয়ম মেনে বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর এ রায়টি কন্টিনিউয়াস মেন্ডামাস আকারে চলমান থাকবে বলেও জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাস গুপ্ত।

বিশ্বকবি রবীন্দ্র ঠাকুরের রবীন্দ্র কাচারিবাড়ি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে শাহজাদপুরের কাচারিবাড়ি। ১৮৯০ থেকে ১৮৯৭ পর্যন্ত কবি এখানে অবস্থান করেন এবং জমিদারি দেখাশোনা করেন। মূলত জমিদারি দেখাশোনার কাজেই তিনি কুষ্টিয়া থেকে মাঝে মধ্যে কাচারিবাড়িতে আসতেন।

১৮৪০ সালে শাহজাদপুরের জমিদারি নিলামে উঠলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ (দাদা) প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর মাত্র তের টাকা দশ আনায় এ জমিদারি কিনে নেন। সেসময় জমিদারির সঙ্গে শাহজাদপুরের কাচারিবাড়িটিও ঠাকুর পরিবারের হস্তগত হয়েছিল। কবি পূর্ব বাংলায় অবস্থানের বেশিরভাগ সময়ই শাহজাদপুরে অবস্থান করতেন। এ বাড়ির প্রতিটি আঙিনা সবসময় মুখরিত থাকতো কবির পদচারণায়। শাহজাদপুরের আকাশ, বাতাস, পাখির কলরব, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নদীর ডেউ কবিকে সবসময় আন্দোলিত করতো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ সালের দিকে প্রথম শাহজাদপুর এ কুঠিবাড়িতে আসেন এবং আর এ বাড়ির আঙিনায় বসেই কবি রচনা করেছেন অজস্র কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাসসহ অনেক বিখ্যাত কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। কবি এখানে বসেই রচনা করেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ সোনার তরী, বৈষ্ণব কবিতা, দুইপাখি, আকাশের চাঁদ, পুরস্কার, হৃদয়, যমুনা, চিত্রা, চৈতালী ইত্যাদি। গীতাঞ্জলি কাব্যের কাজও শুরু করেন এখান থেকে যার জন্য পরবর্তীতে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। পোস্ট মাস্টার গল্পের ‘রতন’ চরিত্রও শাহজাদপুরে বসেই লেখা। চিত্রা, শীতে ও বসন্তে, নগর সঙ্গীতে এবং চৈত্রালীর ২৮টি কবিতা, ছিন্ন পত্রাবলীর ৩৮টি,পঞ্চভূতের অংশবিশেষ এবং বিসর্জনের নাটক তিনি শাহজাদপুরে বসেই রচনা করেছেন।

শাহজাদপুরের কাচারিবাড়ি ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত একটি দ্বিতল ভবন। ভবনটির নিচের তলাতে তিনটি কক্ষ এবং উপরের তলাতে চারটি কক্ষ রয়েছে। দোতালায় ওঠার জন্য একটি প্যাঁচানো সিঁড়ি নিচতলা থেকে উপরে উঠে গেছে। মূলত এ বাড়িটিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাদুঘরটি। আগে এ বাড়ির মালিক ছিল নীলকর সাহেবরা। এখানে এখনো নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। বাড়ির সামনের বিশাল জায়গাজুড়ে রয়েছে ফুলের বাগান। নতুনভাবে একটি অডিটোরিয়াম তৈরি করা হয়েছে। ১৯৬৯ সনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় এ ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার এ কুঠিবাড়িটির গুরুত্ব অনুধাবন করে। কবি রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন শিল্পকর্ম সংগ্রহপূর্বক একে একটি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কাচারিবাড়ির নিচের তিনটি ঘর এবং উপরের চারটি ঘর রবীন্দ্রনাথের আলোকচিত্র ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। নিচের সবগুলো ঘরই আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে।

জাদুঘরে কবির সময়কার ব্যবহার্য নানান আসবাবপত্র সংরক্ষণ করে তৈরি করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্মৃতি জাদুঘর। জাদুঘর ও কাচারিবাড়ি দেখার জন্য প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও দেশের বাইরে থেকে প্রচুর দর্শনার্থী আসেন শাহজাদপুরের এ কাচারিবাড়িতে।

scroll to top