ই-কমার্স: গ্রাহকদের টাকা ফেরতের রিটের শুনানি পেছালো!

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে পণ্য কিনতে গিয়ে পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা টাকা গ্রাহকদের ফেরত দিতে করা পৃথক তিনটি রিটের ওপর পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য সোমবার (২৩ মে) দিন ঠিক করেছেন হাইকোর্ট।

শুনানির নির্ধারিত দিনে রোববার (২২ মে) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল আদেশের বিষয়টি কোর্ট নিউজ টোয়েন্টিফোরকে নিশ্চিত করেন।

আদালতে এদিন রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুর্টি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ।

এর আগে গত ২১ এপ্রিল হাইকোর্টের একই বেঞ্চ আদেশের জন্য আজকের দিন ঠিক করে আদেশ দেন। আজ আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সেটি এফিডেভিট আকারে জমা দিতে না পারায় আজ তারা নট টুডে নেন। এরপর শুনানির জন্য এই আদেশ দেন আদালত।গত ২১ এপ্রিল আইনজীবী হুমায়ুন কবির পল্লব বলেন, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ ওঠা ৫০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টির ব্যাপারে আংশিক তদন্ত শেষ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করেছে বিএফআইইউ। এরপর এ বিষয়ে শুনানির জন্য ২২ মে দিন ধার্য করেন আদালত।

তিনি বলেন, ই-কমার্স মামলার এসব প্রতিবেদন নিয়ে আজ শুনানি ও আদেশের জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করার জন্য আদালত এদিন শুনানি না করে ২২ মে পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন। বিএফআইইউ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তাদের প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছে। দাখিল করা প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে আদালত পরবর্তী আদেশ দেবেন।প্রতিবেদন অনুযায়ী তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এমন ১৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোয় প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা নেই বললেই চলে। বাকি টাকা কোথায় গেছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে নেই। এসব প্রতিষ্ঠান অর্থপাচার করেছে কি না, সে ব্যাপারেও কিছু বলা হয়নি।

তবে বিএফআইইউয়ের পক্ষে তাদের আইনজীবী হাইকোর্টকে জানিয়েছেন, ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকমসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোথায় গেছে, পাচার হয়েছে কি না সে ব্যাপারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে।

এর আগে হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২৫ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ডটকমের ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৬৭টি হিসাবের আনুষঙ্গিক দলিলাদি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিসাবগুলোতে লেনদেনের বিবরণী থেকে জানা গেছে, ইভ্যালি ডটকম লিমিটেড ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নামে প্রাপ্ত ৩৬টি হিসাবে (সঞ্চয়ী চলতি) মোট ৩৮৯৮ দশমিক ৮২ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমা প্রায় ১৯৫৬ দশমিক ১৯ কোটি টাকা ও উত্তোলন হয়েছে প্রায় ১৯৪ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেলিম রেজা, ফরিদ হোসোইন, তারিক রহমান রাকিবুর ৫০ কোটি টাকা নগদ উত্তোলন করেছেন। ৩৬টি অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ বিষয়ে বিএফআইইউ কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পলিসি কী, তা জানার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে সংশ্লিষ্টরা এ প্রতিবেদন জমা দেন।গত বছরের ২৫ নভেম্বর এ বিষয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানি হয়।এর আগে আদেশ অনুযায়ী শুনানিতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন না পেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি গত ১৬ নভেম্বর উষ্মা প্রকাশ করেন হাইকোর্টের গঠিত বেঞ্চ।

গত ২০ সেপ্টেম্বর ই-কমার্সের গ্রাহকদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় জাতীয় ডিজিটাল কমার্স পলিসির ম্যান্ডেট অনুসারে একটি স্বাধীন ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আনোয়ারুল ইসলাম।২৩ সেপ্টেম্বর ই-অরেঞ্জে কোটি কোটি টাকা আটকে থাকা ৩৩ জন গ্রাহক ডিজিটাল বা ই-প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরির জন্য অর্থনীতিবিদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, ব্যবসায়ী ও অন্য অংশীজনদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন এবং ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট করেন। তাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

২২ সেপ্টেম্বর মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন, ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জের দুজন গ্রাহকের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব আরেকটি রিট করেন।রিটে কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা ব্যর্থতায় ইভ্যালি, আলেশা মার্ট, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, দারাজ, কিউকম, আলাদিনের প্রদীপ ও দালাল প্লাসের মতো পরিচিত বাজার থেকে পণ্যের জন্য লাখ লাখ গ্রাহকের ক্ষতি ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ণয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারকের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়। ওই তিন রিট একত্রে শুনানি নিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর আদালত এসব আদেশ দেন।

scroll to top