মানবতাবিরোধী দুই অপরাধীর রিভিউ ও ৩০ আপীল শুনানির অপেক্ষায়!

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত ৩০টি মামলায় আসামিদের খালাস চেয়ে করা আপিল আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়। চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আরও দুই আসামির রিভিউ আবেদন। করোনা উদ্ভূত পরিস্থিতির জট কাটিয়ে আবার চাঙা হচ্ছে এসব মামলা। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৯টি রায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। আরও দুটি মামলা সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। লকডাউনের কারণে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের পক্ষে করা রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদন বিচারাধীন। এছাড়া যুদ্ধাপরাধী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন, গাইবান্ধার আজিজুর রহমান ও নোয়াখালীর সাইফুদ্দিন আহমেদসহ আরও ৩০টি আপিল সর্বোচ্চ আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে একজন খালাস, ২২ আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ৭১ মৃত্যুদণ্ড!মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১০ সালে গঠনের পর ২০১৩ সাল থেকে রায় ঘোষণা শুরু হয়। এরপর প্রতি বছর কোনো না কোনো মামলার রায় হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর গত ১১ বছরে ৪৩ মামলায় মোট সাজা দেওয়া হয়েছে ১০৩ জনকে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে ৭১ জনের। আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে ২২ জনের, অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড হয়। শিশু বয়স বিবেচনায় খালাস দেওয়া হয়েছে এক আসামিকে।
সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ৯টি আপিল
ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে ৯টি মামলা। এর মধ্যে ৯টি রায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পরে ছয়জন আসামির ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে জামায়াত নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মো. কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের মীর কাসেম আলীর। সবশেষ কার্যকর হয়েছে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামায়াতের মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায়।

ঘোষিত রায়ের মধ্যে আপিল বিভাগে বর্তমানে বিচারাধীন ৩০টি মামলা। প্রায় দেড় বছর আপিল বিভাগে এ মামলাগুলোর কোনো শুনানি হয়নি। এসব মামলায় মৃত্যুদণ্ডের আসামি অন্তত ৩৩ জন। মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত দুজনের মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে।
জানা যায়, বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পযর্ন্ত সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম মাঝে মধ্যে বন্ধ থাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের করা আপিল আবেদনসহ সব গুরুত্বপূর্ণ মামলায় করা আপিল বিভাগে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, দেশান্তর ও ধর্মান্তরসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মোট ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এটিকে সরকারের সাফল্য বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের আইনজীবীরা এতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তাদের দাবি, স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৫ বছর পর শুরু হওয়া বিচার অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করা হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে বেশি সংখ্যক আসামির দণ্ড কার্যকর ও দণ্ড ঘোষণার নজির আর নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে। একাত্তরে সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তর, দেশান্তর এবং নির্যাতনের দায়ে ১৯৭২ সালে বিচার শুরু হলেও তা শেষ করা হয়নি। তারপর ১৯৭৫ সালের পরে এসে পুরোপুরি অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তবে কলঙ্ক মুক্তির এ ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে।

প্রথম রায়-
২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম রায় দেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে জামায়াতের সাবেক রোকন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ হয়। পলাতক থাকায় তার রায় এখনো কার্যকর করা যায়নি।

২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি দেওয়া রায়ে যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর আপিল বিভাগে এ রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে একই বছরের ২৯ অক্টোবর আবেদন করেন কায়সার। অন্যদিকে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর গত বছরের ১৯ জুলাই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আইনজীবীদের মাধ্যমে আবেদন করেন আজহার। দুটি রিভিউ আবেদনই শুনানির অপেক্ষায়।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পর্যায়ক্রমে শুনানির অপেক্ষায়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার মোবারক হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আফসার হোসেন চুটু ও মাহিদুর রহমান, পটুয়াখালীর ফোরকান মল্লিক, বাগেরহাটের সিরাজুল হক ও খান আকরাম হোসেন, নেত্রকোনার আতাউর রহমান ননী ও ওবায়দুল হক খান তাহের, কিশোরগঞ্জের শামসুদ্দিন আহমেদ, হবিগঞ্জের মহিবুর রহমান বড় মিয়া, মুজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়া ও আবদুর রাজ্জাক, জামালপুরের সামসুল হক ওরফে বদর ভাই ও এসএম ইউসুফ আলী এবং যশোরের সাবেক এমপি জামায়াত নেতা সাখাওয়াত হোসেন ও বিল্লাল হোসেন, নোয়াখালীর সুধারামের আমীর আলী ও জয়নাল আবেদীন, মৌলভীবাজারের উজের আহমেদ ও ইউনুছ আহমেদ, ফুলবাড়িয়ার রিয়াজউদ্দিন ফকিরসহ আরও অনেকের আপিল।
আপিল বিভাগের পেন্ডিং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার শুনানির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন
কোর্ট নিউজকে বলেন, কোর্ট খোলা হয়েছে, লকডাউনের কারণে এতদিন আদালত সীমিত আকারে চলছিল। কিন্তু ওই সময় অনেক চাঞ্চল্যকর গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি করা যায়নি। এখন যেহেতু আদালত খুলছে আমরা পর্যায়ক্রমে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মানবতাবিরোধী অপরাধের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের করা রিভিউ আবেদন ও আপিল আবেদনসহ গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত মামলা শুনানির উদ্যোগ নেবো।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলার রায়ের পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল আবেদন পেন্ডিং থাকার বিষয়ে প্রসিকিউটির সৈয়দ হায়দার আলী কোর্ট নিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে কোনো আসামির আপিল আবেদন করা হলে সেটি রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল দেখেন। আপিল বিভাগের মামলা পেন্ডিং থাকার বিষয়ে আমরা রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার সঙ্গে অফিসিয়ালি কথা বলতে পারি। এছাড়া আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা আপিল বিভাগে পেন্ডিং থাকা আসামিদের মামলার বিষয়ে কথা বলছি, তখন অ্যাটর্নি জেনারেলও আমাদের বলছেন মামলাগুলো ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পর্যায়ক্রমে ওনারা দেখবেন। আশা করি এসব মামলার শুনানি হবে অচিরেই।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির জন্য পেন্ডিং আপিল আবেদনের বিষয়ে মান রিভিউ ও আপিল নিয়ে প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত কোর্ট নিউজ টোয়েন্টিফোরকে কে বলেন, আপিল বিভাগে হবিগঞ্জের সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের করা রিভিউ আবেদনটি শুনানি করে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি আর হলো না। অর্থাৎ মোটিামুটি ধরা যায় যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এই মুহূর্তে মোটামুটি একটা (স্ট্যান্ট স্টিলের) জায়গায় আছে।

‘আপিল বিভাগের মামলা শুনানির জন্য সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে। আইনজীবী হিসেবে আমাদের কোনো দাবি না থাকলেও প্রতিকার প্রার্থী জনগণ যারা, তদের আকাঙ্ক্ষা তো আছেই, সঙ্গে জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিচার কবে শেষ হয়ে রায় কবে কার্যকর হবে।’

scroll to top