তিন মাস আগে কারাগারে পরিকল্পনা, নেতৃত্বে আয়মান!

ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালত চত্বর থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তিন মাস আগেই করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যান থেকে যেভাবে জঙ্গিদের ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল সেভাবে ছিনিয়ে নেওয়া।

কিন্তু এবার প্রিজনভ্যানে হামলা করাটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল জঙ্গিদের কাছে। কারণ কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে জঙ্গিদের আনার সময় নিরাপত্তা ছিল বেশি। তাই তারা আদালতপাড়াকেই নিরাপদ জায়গা মনে করে। আর এসব পরিকল্পনা কারাগারের ভেতর থেকেই করেন জঙ্গিরা।এরপর জঙ্গিরা বিষয়টি বাইরে থাকা সহযোগীদের জানিয়ে দেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই রোববার (২০ নভেম্বর) আদালত এলাকায় উপস্থিত হন সহযোগীরা। এতে সরাসরি নেতৃত্ব দেন আয়মান ওরফে মশিউর রহমান (৩৭) নামে আনসার আল ইসলামের এক নেতা।রিমান্ডে থাকা আরাফাত ও সবুরকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে এসব কথা জানায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় যে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারে চলছে অভিযান।

এর আগে রোববার (২০ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পুলিশের চোখে স্প্রে করে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তারা হলেন মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেল।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, এই দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিতে প্রায় সাত মাস আগে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে অনলাইন থেকে মোটরসাইকেল কেনেন তাদের সহযোগীরা। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী রোববার সকাল থেকেই আদালত এলাকায় অবস্থান নেয় ১০-১২ জনের একটি দল। যারা সবাই আনসার আল ইসলামের সদস্য।

সূত্রটি আরও জানায়, দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার সময় তাদের সহযোগীরা ঘটনাস্থলে একটি মোটরসাইকেল ফেলে যান। হরনেট ব্র্যান্ডের ওই মোটরসাইকেলটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর-ঢাকা মেট্রো-ল-৩১-৫৭১০। এরইমধ্যে মোটরসাইকেলের মালিক হাসান আল মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।সিটিটিসির কর্মকর্তাদের হাসান জানান, চলতি বছরের মে মাসে বিক্রয় ডটকমের মাধ্যমে তিনি মোটরসাইকেলটি বিক্রি করেন। ক্রেতা তাকে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রও দিয়েছিলেন। ওই পরিচয়পত্রের অনুলিপিতে আতিকুজ্জামান নাম লেখা ছিল।

কে এই আয়মান?

সিটিটিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, আনসার আল ইসলামের আসকারি বা সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আয়মান। তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। তিনি ২০১৬ সালে সরকারি কর্ম কমিশনের রংপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ঘর ছাড়েন।

সূত্র জানিয়েছে, জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার মাস্টারমাইন্ড বা প্রধান পরিকল্পনাকারী সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া। আনসার আল ইসলামের প্রতিটি অপারেশন বা কার্যক্রমই শুরা বোর্ড এবং জিয়ার কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়।

আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

এদিকে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। জঙ্গিদের আদালতে আনার দিন নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. গোলাম ছারোয়ার খান জাকির।

আদালতের নিরাপত্তার ঘাটতি আছে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলতে পারবে। তবে অবশ্যই নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার হওয়া উচিত ছিল। তাদের কীভাবে নামিয়ে আনা হয়েছিল তা জানি না।আদালত এলাকা পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়েছি। আমাদের ডিবির প্রত্যেকটা টিম কাজ করছে। আশা করছি তাদের (পালিয়ে যাওয়া জঙ্গি) দ্রুত গ্রেফতার করতে পারবো।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

বরখাস্ত পাঁচ পুলিশ

পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, জঙ্গিদের ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আদালতের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকা পুলিশের পাঁচ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- সিএমএম আদালতের হাজতখানার কোর্ট ইন্সপেক্টর মতিউর রহমান, হাজতখানার ইনচার্জ (এসআই) নাহিদুর রহমান ভূঁইয়া, আসামিদের আদালতে নেওয়ার দায়িত্বরত পুলিশের এটিএসআই মহিউদ্দিন, কনস্টেবল শরিফ হাসান ও আব্দুস সাত্তার।

মামলার এজাহারে যা আছে

জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার এজাহারে বলা হয়েছে, রোববার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে কাশিমপুর থেকে ১২ আসামিকে ঢাকার আদালতে নিয়ে আসা হয়। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে আসামিদের হাজিরা দেওয়ার জন্য সিজেএম আদালত ভবনের সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল ৮-এ নিয়ে যাওয়া হয়। এ মামলার শুনানি শেষে জামিনে থাকা ১৩ নম্বর আসামি মো. ঈদী আমিন (২৭) ও ১৪ নম্বর আসামি মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফি (২৪) আদালত থেকে বের হয়ে যান।

এরপর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে আদালতের মূল ফটকের সামনে পৌঁছানো মাত্রই আগে থেকে দুটি মোটরসাইকেলে আসা ৫-৬ জন সদস্য, আদালতের আশপাশে অবস্থানরত আরও ১০-১২ জন সদস্য পুলিশের ওপর হামলা করে। তারা কনস্টেবল আজাদের হেফাজতে থাকা মইনুল হাসান শামিম ওরফে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান, মো. আবু সিদ্দিক সোহেল মো. আরাফাত রহমান ও মো. আ. সবুর ওরফে রাজু ওরফে সাদ ওরফে সুজনকে ছিনিয়ে নিতে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে।

পুলিশ সদস্যরা তাদের বাধা দিলে আসামিদের মধ্যে কোনো একজন তার হাতে থাকা লোহা কাটার যন্ত্র দিয়ে কনস্টেবল আজাদের মুখে আঘাত করেন।

এরপর তারা পুলিশের চোখে স্প্রে করে মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেলকে ছিনিয়ে নিয়ে যান। এই দুই জঙ্গি প্রকাশক দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।

scroll to top