সাইবার ট্রাইবুনালে কখন,কেন,কিভাবে মামলা করবেন

যে কোন ধরনের ক্রাইম বা অপরাধ যখন অনলাইন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘটে, তখন তাকে সাইবার ক্রাইম বা অপরাধ বলে। এটিই সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞা। আর সাইবার ক্রাইম বা অপরাধের বিচারের জন্য দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সাইবার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। যে সব ডিজিটাল ক্রাইম/অপরাধের (সাইবার ক্রাইমের) মামলা আনায়ন করা যায় এই সাইবার ট্রাইব্যুনালে।

সাইবার আদালতে কখন, কেন মামলা করবেন!

যখন আপনি সাইবার অপরাধের শিকার হবেন তখন অবশ্যই মামলা আনায়ন করে প্রতিকার পেতে পারেন। তাহলে জেনে নেওয়া যাক কোন ধরনের অপরাধ সমুহ হলে মামলা আনায়ন করা যেতে পারে বা সাইবার ক্রাইম এর নমুনাঃ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানি: ফেসবুকে সাইবার ক্রাইম এখন মামুলি বিষয় হয়ে গিয়েছে। আপনি ফেসবুকে বা সামাজিক গণমাধ্যমে সাইবার ক্রাইমের শিকার হলে যখন আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন :

সাইবার বুলিং- কেউ যদি অনলাইনে আপনাকে অহেতুক জ্বালাতন করে এবং আপনার সম্মানহানি করার চেষ্টা করে অথবা অনলাইনে যেকোনো উপায়েই হোক কেউ যদি আপনাকে উত্যক্ত করে তাহলে তা সাইবার বুলিং হিসেবে স্বীকৃত। সেক্ষেত্রে তা যদি অনলাইনে হয় তাহলে আপনি তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

অনলাইনে মানহানি- আপনার আর আপনার প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করার জন্য কেউ যদি উঠে পড়ে লাগে এবং সেক্ষেত্রে তা যদি অনলাইনে হয় তাহলে আপনি তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

আইডি হ্যাক-আপনার ফেসবুক আইডি কেউ যদি হ্যাক করে থাকে আর আপনার ব্যক্তিগত ছবি আর কথোপকথন অনলাইনে ছেড়ে দেবে বলে যদি হুমকি প্রদান করে, পাশাপাশি তা ঠেকানোর জন্য তার বিনিময়ে যদি সে আপনার কাছে অর্থ দাবি করে সেক্ষেত্রে আপনি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

সেক্সুয়ালি এবিউজ- কেউ যদি অনলাইনে আপনার ছবি দিয়ে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আইডি খুলে, আপনার ছবি ব্যবহার করে কোনো পোস্ট প্রদান করে। আপনার ছবির সাথে অন্য ছবি জোড়া লাগিয়ে বিতর্কিত কিছু বানোয়াট খবর প্রকাশ করে, আপনার ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও অনলাইনে প্রকাশ করে, পাশাপাশি তা ঠেকানোর জন্য তার বিনিময়ে যদি সে আপনার কাছে অর্থ দাবি করে সেক্ষেত্রে আপনি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

হ্যাকিং- অনলাইনে ডাটা বা তথ্য অনুমতিবিহীন চুরি, ধ্বংস বা ক্ষতিসাধন করার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় হ্যাকিং। এতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য চুরি হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম ক্ষুন্ন হয়।

আর সহজ করে বলতে গেলে অপরাধগুলো হলো এমন-

• সামাজিক মাধ্যমে ফেক আইডি খুলে জ্বালাতন

• সামাজিক মাধ্যমের আইডি, ইমেইল অথবা ওয়েব সাইট হ্যাক

• সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন ট্রল গ্রুপ বা পেজে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া

• বিভিন্ন পর্নো ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ধারণ করা ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া

• সামাজিক মাধ্যমের আইডি হ্যাক করে অর্থ দাবি

• ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদান ও হয়রানি

• কাউকে মারধর করে তার ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া

• কোনো কিশোরী বা যুবতী বা নারীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে তার ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া

• অনলাইনে ইকমার্সের নামে ভুয়া পেজ খুলে খারাপ পণ্য বিক্রির নামে হয়রানি

• অনলাইনে পরিচিত হয়ে অনলাইন কারেন্সি ট্রাঞ্জেকশন করতে গিয়ে ফ্রডের শিকার

• ভুয়া বিকাশ নম্বর থেকে ফোন করে লটারির কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ

• ভুয়া বিকাশের এসএমএস দিয়ে গ্রাহককে দিয়েই অভিনব কায়দায় প্রতারণা

• অনলাইনে ব্যাংক একাউন্ট আর এটিএম কার্ডের ডিটেইলস চুরি করে অর্থ চুরি

• অনলাইনে স্প্যামিং এবং গণ রিপোর্ট

• অনলাইনে স্ক্যামিং

• অনলাইনে বিভিন্ন সেলেব্রেটি বা মানুষের নামে ভুয়া তথ্য ছড়ানো বা খবর প্রচার

সাইবার অপরাধ বা সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়ে গেলে মামলা করার ক্ষেত্রে আপনার করণীয় :

করণীয় বা প্রতিকার দুই ভাবে পেতে পারেনঃ

১। থানায় এজাহার দায়েরের মাধ্যমে মামলা করে
২। সরাসরি সাইবার ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের করে।

**থানায় এজাহার দায়েরের মাধ্যমে মামলা করার ক্ষেত্রে করণীয়:

প্রমাণগুলো সঠিকভাবে কালেক্ট করা। বাচাই করে সেগুলো প্রিন্ট করে ফেলা। স্ক্রিন ভিডিও এবং লিংকসহ প্রমাণ যোগাড় করা। তারপর থানায় যাবেন। লিখিত আকারে অভিযোগ দায়ের করবেন। অভিযোগ দায়েরর পর এটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হইবে ।

সরাসরি সাইবার ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের কিংবা থানা মামলা গ্রহন না করলে ট্র্রাইবুনালে মামলা দায়েরঃ

কোনো কারণে যদি থানা মামলা না নেয় তখন আইনজীবীর সহায়তা নিয়ে যাবতীয় প্রমাণাদি সহ সরাসরি সাইবার ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের করতে হবে। আইনজীবীর নিকট যাবতীয় প্রমাণাদি উপস্থাপন করে পুরো ঘটনাটা শেয়ার করুন। বিজ্ঞ আইনজীবী আপনার অভিযোগটি শুনে সাক্ষ্য প্রমাণিাদিসহ লিখিত আকারে উপস্থাপন করে মামলাটি ট্রাইবুনালে উপস্থাপন করবে। বিজ্ঞ আদালত আপনার জবানবন্দী গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করবেন। এমনকি আদালত মনে করলে মামলাটি তদন্তের জন্য কোন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান কিংবা সরাসরি আমলেও নিতে পারেন। আদালতে মামলা আনায়ন করতে হলে বাদীর একটি হলফনামাও দিতে হয়।

পুলিশের ‘অল উইমেন ইউনিটে’ অভিযোগ জানাতে পারবে নারীরা-

সাইবার অপরাধের শিকার নারীরা যাতে সহজে এবং ভয়ভীতিহীনভাবে অভিযোগ জানাতে ও প্রতিকার চাইতে পারে, সে জন্য ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামে একটি অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ চালু করা হয়েছে।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’–এটি মূলত একটি তথ্য জানানোর সেবা, যেখানে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং পরামর্শ প্রদানসহ সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা থাকবেন পুলিশের নারী সদস্যরা।

এক্ষেত্রে অভিযোগকারী নারী নিজের পরিচয় গোপন রেখেও নিজের ওপর সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে তথ্য দিতে এবং প্রতিকার চাইতে পারবেন।

ভুক্তভোগী নারীকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা করবে পুলিশ। সেই সঙ্গে তাকে সাইবার সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হবে।

কীভাবে অভিযোগ জানাতে হবে
এই ইউনিটে অভিযোগ জানাতে হলে একজন ভুক্তভোগী দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ইমেইল করে বা হটলাইন নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারবেন।

অভিযোগ জানানোর জন্য নিম্নোক্ত উপায়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে

Police Cyber Support for Women PCSW নামে ফেসবুক পেইজে মেসেজ দিয়ে অভিযোগ জানাতে হবে
[email protected] এই ঠিকানায় ইমেইল করা যাবে
পুলিশ সদর দফতরের ০১৩২০০০০৮৮৮ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানানো যাবে
হটলাইন নম্বর ৯৯৯ এ ফোন করেও অভিযোগ করা যাবে।

-মোহাম্মদ তরিক উল্যাহ (এম টি উল্যাহ)
আইনজীবী

[email protected]

লেখক- আইন বিষয়ক উপন্যাস ‘নিরু’ ও ‘অসমাপ্ত জবানবন্দী’।

scroll to top