সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী পালিত!

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া মাহবুবে আলম ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান। সে হিসাবে তার মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হলো।

মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) মাহবুবে আলমের মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে কোনো আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় আইনজীবীরা শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন।মাহবুবে আলম ২০২১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কোভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্ত হন। ওইদিন থেকেই সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এরমধ্যে ১৮ সেপ্টেম্বর তার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর থেকে তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছিলেন। সেখানে ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, এবং আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা অ্যাটর্নি জেনারেল। দেশের ১৫তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। এর আগে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশে এমন এক সময় অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে ছিলেন মাহবুবে আলম যখন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার এবং বিচার বিভাগকে ঘিরে নানা বিতর্কের কারণে সারাক্ষণই তার দপ্তর ছিল গণমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রে।তিনি দীর্ঘকাল একজন আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বও দিয়েছেন। ২০০৯ সালে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইন পেশায় আসার শুরু থেকেই মাহবুবে আলম আইনজীবীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি ছিলেন, আবার সরকার নিয়োজিত অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন কোর্টে সরকারের হয়ে ১০-১৫টি, কোনোদিন আবার ২০টি মামলায় একই দিনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মামলায় আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন মাহবুবে আলম। তিনি সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বিডিআর বিদ্রোহ হত্যা মামলা, এবং সর্বোচ্চ আদালতে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধ মামলার মতো অনেক আলোচিত মামলার আইনজীবী ছিলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে পদাধিকারবলে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

মাহবুবে আলম ১৯৪৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দ্রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও ১৯৬৯ সালে লোক প্রশাসনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন মাহবুবে আলম। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। ১৯৭৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এবং ১৯৮০ সালে আপিল বিভাগে আইন পেশা পরিচালনার অনুমতি পান।

১৯৯৮ সালে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন মাহবুবে আলম। এ ছাড়া তিনি ১৯৭৯ সালে ভারতের নয়াদিল্লির ‘ইনস্টিটিউট অব কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ’ থেকে সাংবিধানিক আইন ও সংসদীয় প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতি বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৮ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ২০০১ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত রাষ্ট্রের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাহবুবে আলম।

এর মধ্যে ১৯৯৩-৯৪ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৫-০৬ মেয়াদে তিনি আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।

২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি মাহবুবে আলম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর থেকে টানা ১২ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই সঙ্গে পদাধিকার বলে তিনি আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মামলায় আইনজীবী হিসেবে যুক্ত থাকা মাহবুবে আলম সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ছিলেন। এছাড়া তিনি বিডিআর বিদ্রোহ হত্যা মামলাসহ সর্বোচ্চ আদালতে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধ মামলার মতো ঐতিহাসিক অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলা সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছেন।

মাহবুবে আলম দেশ ও দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন। এরই অংশ হিসেবে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, হংকং, কোরিয়া ও তানজানিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশ সফর করেছেন রাষ্ট্রের সাবেক এই প্রধান আইন কর্মকর্তা।

scroll to top